স্বাধীনতাকামীদের প্রেরণা বঙ্গবন্ধু

প্রকাশিত: ৫:১৬ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৫, ২০২১

স্বাধীনতাকামীদের প্রেরণা বঙ্গবন্ধু

ড. এ কে আবদুল মোমেন
মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্ব ও অহংকার। দীর্ঘ ন’মাসের রক্তক্ষয়ী এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে আমাদের এ বাংলাদেশ। এ যুদ্ধের মূল প্রেরণা ও পথনির্দেশিকা হিসাবে কাজ করেছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। ৭ মার্চ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে একটি সমাবেশ হয় এবং তাতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। দুপুর থেকেই আমরা যখন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক রেসকোর্সের বক্তৃতা শোনার জন্য জমায়েত হই, তখন উপরে বারবার সামরিক হেলিকপ্টার ও বিমান চলে এবং আমরা তখন স্থির নিশ্চিত যে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেবেন।
আমাদের আশা কিন্তু তিনি পূরণ করেন। তার অপূর্ব বলিষ্ঠ ভাষণের প্রতিটি শব্দ আমাদের হৃদয় পুলকিত করে, রক্ত-গরম করে, স্বাধীনতার দৃঢ় প্রত্যয়ে আমরা উজ্জীবিত হই। তিনি অর্বাচীনের মতো বলেননি ‘আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলাম’। তার পরিবর্তে তিনি বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। শুধু তাই বলে ক্ষান্ত হননি। তিনি আরও বলেন, ‘…আপনারা জানেন ও বোঝেন …মনে রাখবা আমি যদি তোমাদের হুকুম দিতে নাও পারি, তোমাদের যা যা আছে; তাই দিয়েই শত্রুর মোকাবিলা কর। … ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।’
বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণা আইনের মারপ্যাঁচে হুবহু না দিলেও ‘আখলবন্ধ’ স্বাধীনচেতা সংগ্রামী বাঙালিদের কীভাবে কী করতে হবে, তার নির্দেশনা দিয়ে যান। ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি…’ বক্তব্যের মধ্যে তিনি জাতিকে সজাগ করে দেন যে, তাকে যদি পাকবাহিনী হত্যা করে বা কারারুদ্ধ করে; তখন আমাদের কী করতে হবে। ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো …যার যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে…এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম…’ আনুষ্ঠানিকভাবে একে ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ না-বললেও তার ভাষণে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য কী কী করা প্রয়োজন, তার সব ইঙ্গিত ও নির্দেশনা এতে রয়েছে।
প্যারিসে বাংলাদেশি দূতাবাস এবং ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন জাতিসংঘের ছয়টি দাপ্তরিক ভাষায় বাঙালি জাতির স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণসংবলিত গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ৫ মার্চ ২০২১, শুক্রবার ‘দ্য হিস্টোরিক সেভেন্থ মার্চ স্পিস অব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-দ্য ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ বা ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ-বিশ্ব ঐতিহ্য দলিল’ শীর্ষক এ গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, আরবি, রুশ ও চীনা এ ছয়টি ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের এ সংকলন। এ সময় বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী ১২ জন রাষ্ট্রদূত ও ইউনেস্কোতে স্থায়ী প্রতিনিধিরা যৌথভাবে গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করেন। এই প্রথম বঙ্গবন্ধুর ভাষণ জাতিসংঘের সব দাপ্তরিক ভাষায় অনূদিত হলো এবং তা সবার পাঠের সুবিধার্থে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলো। বাঙালি জাতির জন্য এ এক বিরাট গর্বের বিষয়।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নিয়ে প্রকাশিত এ গ্রন্থে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর বিশেষ বাণী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যৌথভাবে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ-বিশ্ব ঐতিহ্য দলিল’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন ইউনেস্কোতে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, আইভরিকোস্ট, সেনেগাল, স্পেন, কিউবা, সৌদি আরব, মৌরিতানিয়া, কুয়েত, রাশিয়া, চীন ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সব রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধিরা তাদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সফল নেতৃত্ব প্রদানে এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং এ গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনার জন্য ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের এ উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কোর স্বীকৃতির মধ্যদিয়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাংলাদেশের সীমা ছাড়িয়ে বিশ্ব ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জ্যাকব এফফিল্ড বিশ্বের সেরা বক্তৃতাগুলো নিয়ে ‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস-দ্য স্পিচেস দ্যাট ইন্সপায়ার হিস্ট্রি’ নামে যে বই করেছেন, তাতেও ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্বের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তৃতা হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুধু একটি ঐতিহাসিক নিদর্শনই নয়, গোটা বাঙালি জাতির জন্য একটি এক উদ্দীপ্তমূলক প্রেরণা। যুগে যুগে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে আন্দোলিত করার মতো ভাষণ অনেক নেতাই দিয়েছেন; কিন্তু একইসঙ্গে সেই ভাষণের প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের নজির বিরল। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বাংলাদেশে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন গড়ে ওঠে, ২৫ মার্চের পর যা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে কোমর বেঁধে লড়াইয়ের মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয় জাতি। মাত্র ১৮ মিনিটের ভাষণে সেদিন বঙ্গবন্ধু আমাদের দীর্ঘ সংগ্রাম ও আন্দোলনের পটভূমি তুলে ধরেছেন, দেশবাসীর করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন সুনির্দিষ্টভাবে। এটি ছিল মূলত মুক্তিযুদ্ধের রণকৌশল।
ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে এখন পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সব মহাদেশ থেকে ৪২৭টি গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস বা কালেকশন। মূলত এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে যেসব তথ্যভিত্তিক ঐতিহ্য রয়েছে, সেগুলোকে সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্ম যাতে তা থেকে উপকৃত হতে পারে, সে লক্ষ্যেই এ তালিকা প্রণয়ন করে ইউনেস্কো। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বাংলাদেশসহ বিশ্ব প্রজন্মের প্রেরণার উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত হয়েছে। এ ৪৯ বছরে ৭ মার্চের সেই ভাষণকে পেরোতে হয়েছে দীর্ঘ পথ। পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তৎকালীন বাঙালি সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষণটি ধারণ, মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে প্রাণবাজি রেখেও তা সযত্নে সংরক্ষণ এবং সরকারের পালাবদলের অস্থির সময়ে তা নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা থেকে শুরু করে এর পূর্ণাঙ্গ লিখিত রূপ তৈরি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে ভাষণটিকে কম পথ পেরোতে হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় সংবিধানেও সন্নিবিশিত হয়েছে বাঙালির মুক্তির দলিল এ ভাষণ।
বাঙালির ইতিহাসের মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রণোদনা সৃষ্টিকারী ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ মানবজাতির মূল্যবান ও ঐতিহ্যপূর্ণ সম্পদ হিসাবে আজ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ও গৃহীত। স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গকৃত ৩০ লাখ শহিদ আর সম্ভ্রম হারানো কয়েক লাখ মা-বোনসহ গোটা বাঙালি জাতির জন্য এটি এক মহা-আনন্দ ও বিরল সম্মানের বিষয়। এর আগে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা শহিদ দিবসকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে এখন বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর নিজ ভাষার অধিকার সংরক্ষণের প্রতীক হিসাবে দিবসটি পালিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনে শুধু সংগঠকের ভূমিকাই পালন করেননি, তিনি ছিলেন এ আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দিদের অন্যতম। বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বাঙালির দুটি ঐতিহ্যের নেপথ্যেই রয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।
গ্রিক নগররাষ্ট্র এথেন্সের রাষ্ট্রনায়ক পেরিক্লিসের অপর এক নগররাষ্ট্র স্পার্টার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত স্বদেশীয় সৈন্য ও সাধারণ মানুষের স্মরণে প্রদত্ত ভাষণ (৪৩১ খ্রিষ্টপূর্ব) থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের ১৯৮৭ সালে বার্লিনে দুই জার্মানির মধ্যকার বিভক্তির দেওয়াল (বার্লিন ওয়াল) ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার আহ্বানসংবলিত ভাষণ পর্যন্ত আড়াইহাজার বছরের বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী ৪১ জন সামরিক-বেসামরিক জাতীয় বীরের বিখ্যাত ভাষণ নিয়ে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ঔধপড়ন ঋ ঋরবষফ, ডব ঝযধষষ ঋরমযঃ ড়হ ঞযব ইবধপযবং : ঞযব ঝঢ়ববপযবং ঞযধঃ ওহংঢ়রৎবফ ঐরংঃড়ৎু শিরোনামে একটি গ্রন্থ সংকলন করেন, যা ২০১৩ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থে অন্যদের মধ্যে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট (মেসিডোনিয়া, প্রাচীন গ্রিস), জুলিয়াস সিজার (রোম), অলিভার ক্রমওয়েল (ইংল্যান্ড), জর্জ ওয়াশিংটন (যুক্তরাষ্ট্র), নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (ফ্রান্স), জোসেফ গ্যারিবোল্ডি (ইতালি), আব্রাহাম লিংকন (যুক্তরাষ্ট্র), ভ্লাদিমির লেনিন (রাশিয়া), উইড্রো উইলসন (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), উইনস্টন চার্চিল (যুক্তরাজ্য), ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট (যুক্তরাষ্ট্র), চার্লস দ্য গল (ফ্রান্স), মাও সে তুং (গণচীন), হো চি মিন (ভিয়েতনাম) প্রমুখ নেতার বিখ্যাত ভাষণের পাশাপাশি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির মুক্তির সনদ। বিক্ষোভে উত্তাল রেসকোর্স ময়দানের লাখো জনতার সভামঞ্চে উপস্থিত হয়ে তেজোদীপ্ত কণ্ঠে যে ভাষণ তিনি উচ্চারণ করেন, তার প্রতিটি শব্দ ছিল অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো। হৃদয়ে তার বাঙালির হাজার বছরের মুক্তির স্বপ্ন। মাথার ওপর আকাশে ঘুরছিল পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান। এমনই এক সন্ধিক্ষণে ১৮ মিনিটের সংক্ষিপ্ত অথচ জগদ্বিখ্যাত ভাষণটি প্রদান করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যেমন এর সারগর্ভ, ওজস্বী ও যুক্তিযুক্ত, তেমনি তির্যক, তীক্ষ্ণ ও দিকনির্দেশনাপূর্ণ। অপূর্ব শব্দশৈলী, বাক্যবিন্যাস ও বাচনভঙ্গি। একান্তই আপন, নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে পাকিস্তানের ২৩ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বাঙালিদের অবস্থা ব্যাখ্যা করেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে বাঙালিদের দ্বন্দ্বের স্বরূপ তুলে ধরেন। শান্তিপূর্ণভাবে বাঙালিদের অধিকার আদায়ের চেষ্টার কথা বলেন। অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমি ব্যাখ্যা ও বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সারা বাংলায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ প্রদান করেন। প্রতিরোধ সংগ্রাম শেষাবধি মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেওয়ার ইঙ্গিত ছিল তার বক্তৃতায়। শত্রুর মোকাবিলায় গেরিলাযুদ্ধের কৌশল অবলম্বনের কথাও বললেন তার বক্তৃতায়। যে কোনো উসকানির মুখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি ঘোষণা করেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে…; এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম ভাষণগুলোর অন্যতম। যে কোনো শ্রেষ্ঠ ভাষণমাত্রই প্রচণ্ড উদ্দীপনাময়; মুহূর্তে মানুষকে নবচেতনায় জাগিয়ে তুলে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে তাদের প্রস্তুত করতে পারঙ্গম। ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সমগ্র বাঙালি জাতিকে নজিরবিহীনভাবে ঐক্যবদ্ধ এবং স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল। ভাষণে দৃপ্তকণ্ঠে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা ভাতে মারব। আমরা পানিতে মারব; … আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। … রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ।’ এ ভাষণের মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েই কোনোরূপ আপসকামিতার পথে না-গিয়ে স্বাধীনতা অর্জনে ৩০ লাখ মুক্তিকামী জনতা আত্মোৎসর্গ করেন, যা বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন। এটিই এ ভাষণকে বিশ্বের অন্যান্য শ্রেষ্ঠ ভাষণ থেকে আরও অনন্য করেছে।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের শোষণ ও নিপীড়নের নাগপাশ বন্ধন ছিন্ন করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ ছিল তৃতীয় বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম নজির সৃষ্টিকারী ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল এর মূল প্রেরণা। বাঙালির জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে পরিচালিত দীর্ঘ ঐতিহাসিক আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রেখে এ কথা বললে বোধহয় অত্যুক্তি হবে না যে, একটি ভাষণে একটি জাতি-রাষ্ট্রের সৃষ্টি এবং তা-ও মাত্র নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, যা বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ১৯৪৫ সালে ভিয়েতনামের বিপ্লবী নেতা হো চি মিন বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে ফরাসি ও মার্কিনবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের যে ডাক দিয়েছিলেন, তা দীর্ঘ ত্রিশ বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৯৭৫ সালে সাফল্যের মুখ দেখেছিল। আমেরিকার বর্ণবৈষম্যবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রিয় নেতা বিশ্বনন্দিত মার্টিন লুথার কিং যেভাবে জনগণকে শুধু ‘ও যধাব ধ ফৎবধস’ বা একটি ‘স্বপ্নের কথা’ শুনিয়েই শেষ করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ছিল আরও অগ্রসর। তিনি ৭ মার্চ এক অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জনতার উত্তাল মহাসমুদ্রে হাজির হন বাঙালির হাজার বছরের লালিত স্বাধীনতার স্বপ্নের বাস্তবায়ন তথা বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রামের উদাত্ত আহ্বান নিয়ে। একটি জাতির ভিত্তি গড়ে তোলার বুনিয়াদ হিসাবে এ ভাষণের গুরুত্ব অনুধাবন করেছে বিশ্ববাসী। তৎকালীন বিশ্ব মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সারমর্ম। বর্তমানে গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে, যে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির শ্রেষ্ঠ সম্পদগুলোর অন্যতম। যতদিন বাংলাদেশ আছে, ততদিন এ ভাষণ থাকবে এ দেশের মানুষের অন্তরে অন্তরে। বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে স্বীকৃত হওয়ায় এবং বিভিন্ন ভাষায় এ ভাষণ অনূদিত হয়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ায় আজীবন বিশ্বের মুক্তিকামী জনতা এ ভাষণ থেকে নিজেদের প্রেরণা খুঁজে নেবে।
লেখক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

 

শেয়ার করুন