মহররমের করণীয় বর্জনীয়

প্রকাশিত: ৩:১৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০২০

কৃষি নিউজ বিডি:: মহররমের বিষয়ে আলোচনার আগে হিজরি সন এর সূচনাপর্ব নিয়ে কিছুটা হলেও জেনে নেওয়া আবশ্যক। ইসলাম ধর্মের আগমণের পূর্বে আরব দেশে বিভিন্ন রকমের হিসাব ও গণনা পদ্ধতি চালু ছিল। বিশেষ কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে তারা নতুন একটি সন গণনা করত। সর্বশেষ আবরাহার হস্তিবাহিনী যখন খানায়ে কা’বাকে ধ্বংস করতে এসে নিজেরা ধ্বংস হয়ে যায়, আরববাসীরা এ সময় থেকে আরেকটি সনের সূচনা করল। এখন যে বারোটি আরবি মাস চালু আছে সেগুলো ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবদের মধ্যে চালু ছিল। এ বারোটি মাসের মধ্যে চারটে মাসকে তারা সম্মানিত ঘোষণা করেছিল যুদ্ধ বিগ্রহ থেকে বিরত থাকবে বলে। ইসলামের আবির্ভাবের পরও সে ধারা অব্যাহত রয়ে গেল, নতুন কোনো সনের সূচনা হল না। এতে করে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরণের সমস্যা দেখা দিতে লাগল। শেষ পর্যন্ত নেতৃস্থানীয় সাহাবিরা ব্যাপক আলোচনার পর মুসলিম জাতির জন্য একটি স্বতন্ত্র সন-তারিখ প্রবর্তনের জন্য একমত হলেন। প্রকৃত পক্ষে, হিজরি সন শুরু হয়েছে হিজরতের সাথে সাথেই আর আনুষ্ঠানিকভাবে তা কার্যকর হয়েছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র ইন্তেকালের ৬ বছর পর। মোট কথা, হযরত উমর ফারুক (রা.) স্বীয় শাসনকালে হিজরতের ঘটনার ওপর ভিত্তি করে সরকারিভাবে হিজরি সন চালু করেন আর তা আরম্ভ হয় মহরম মাস থেকে।
পবিত্র ক্বোরআনে হিজরি সনের ১২টি মাসের মধ্যে জিলকদ, জিলহজ্ব, মহরম ও রজব, এ ৪টি মাসকে সম্মানিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। হাদিসের বিভিন্ন ব্যাখ্যাগ্রন্থ এবং সিরাতের কেতাব সমূহে মহরম মাসে সংঘটিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর উল্লেখ রয়েছে।
মহররম মাসে সংঘটিত কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করা যাক। এ মাসের ১০ তারিখ আশুরা দিবসে হযরত আদম (আ.) এর তাওবা কবুল হয়। এদিনে হযরত নূহ (আ.) এর জাহাজ মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি পেয়ে ‘জুদি’ পাহাড়ে স্থির হয়। হযরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইল ফেরাউনের জুলুম-অত্যাচার থেকে চিরমুক্ত হয় এবং ফেরাউন তার বিশাল বাহিনী নিয়ে সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়। এ দিনে হযরত ইসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন এবং এ তারিখে জীবিতাবস্থায় তাকে আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়। হযরত ইউসুফ (আ.) কে কুয়া থেকে বের করা হয়। হযরত আইয়ুব (আ.) কে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়। হযরত ইব্রাহিম (আ.) জন্মলাভ করেন। হযরত সুলাইমান (আ.) কে বাদশাহি প্রদান করা হয়। এছাড়া, আরো বহু ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত মাস হচ্ছে মহরম। এ মাসে সর্বশেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (স.) এর দৌহিত্র হযরত হুসাইন (রা.) এর মহিমান্বিত শাহাদাতের ঘটনা এ দিনে সংঘটিত হয়। এসব কারণে মহরম এর ১০ তারিখ মুসলিম বিশ্ব আজও স্মরণ করে।
মহররম মাসে যা করণীয় : এ মাসে সাধ্যানুযায়ী বেশি বেশি করে রোজা রাখা, বেশি বেশি তাওবা বা ইস্তিগফার করা, কেননা এ মাসে তাওবা কবুলের সমধিক আশা করা যায়। পরিবার-পরিজনের প্রয়োজনে অন্যান্য দিনের তুলনায় সামর্থ অনুযায়ি অধিক ব্যয় করা। ১০ মহররম বা আশুরার দিন রোজা রাখা এবং ৯ বা ১১ মহরমের যে কোন একদিনের রোজা আশুরার রোজার সাথে মেলানো, যাতে করে ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্যতা না হয়। মহররমের উপলক্ষে বর্জণীয় কাজ : আমাদের সমাজে মহররম ও আশুরাকে কেন্দ্র করে তাজিয়া, ঢাকঢোল ও বাজনা, আহাজারি করা, শোকের পোশাক পরিধান করা ইত্যাদি নানাবিধ কুপ্রথা, বিদয়াত ও ইসলাম বিরোধী কাজ গড়ে উঠেছে।
আশুরার সময় তাজিয়া নির্মাণ করা হয় যা একটি মাজার সাদৃশ্য হয়ে থাকে। এ তাজিয়া বহুবিধ ফাসেকি ও মুশরেকি চিন্তাধারার ফসল। কোনো কোনো জাহেলের বিশ্বাস যে, স্বয়ং হযরত হোসেইন (রা.) এতে সমাসীন হয়ে থাকেন। এ বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে তারা তাজিয়ার পাদদেশে নজর-নিয়াজ পেশ করা শিরকের অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং এসব দ্রব্যাদি খাওয়া হারাম।
তাজিয়ার সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ানো, তার দিকে পিঠ না ফেরানো, তাতে বিভিন্ন ধরণের প্রতিকী ব্যানার টাঙানো, তাজিয়া দেখতে যাওয়াকে জিয়ারত বলে আখ্যায়িত করা সহ আরো নানা ধরণের গর্হিত আচরণ এক প্রকার শিরকের অন্তর্ভূক্ত। আশুরার দিন এবং তার আগে ঢাক-ঢোল আর বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজে পরিবেশ কলুষিত হয়ে ওঠে। হাদিস শরিফে কঠোরভাবে একে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কাজটি একদিকে যেমন শরিয়ত বিরোধী অপরদিকে তেমনি বিবেকের পরিপন্থি। একটি শোক মিছিলে বা শোক দিবসকে কেন্দ্র করে ঢোল-তবলার এ আওয়াজ আর জারি ও কাওয়ালির সুর লহরি দিয়ে কেমন শোক প্রকাশ হয়, তা প্রত্যেকের অনুধাবন করা উচিত।
কিছু লোক এদিন ‘হায় হাসান’, ‘হায় হোসেন’ বলে আহাজারি করতে থাকে, বুক চাপড়াতে থাকে। এটা গোনাহর কাজ। হাদিস শরীফে কঠোরভাবে এ কাজ নিষেধ করা হয়েছে। হযরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহাজারিকারী এবং শ্রবণকারীর উপর ‘লানত’ করেছেন।
আশুরা উপলক্ষে বিশেষ ধরণের বা বিশেষ রং এর পোশাক পরে শোক প্রকাশ করা হয়। এটি নিষিদ্ধ বা শরিয়ত বিরোধী কাজ। এরপর রাসুল্লুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি জানাজায় গিয়ে দেখতে পেলেন লোকজন শোক পালনের জন্য বিশেষ ধরণের পোশাক পরিহিত অবস্থায় রয়েছে। তখন তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, তোমরা কি জাহেলি কাজ শুরু করেছ, না জাহেলি প্রথার অনুকরণ করছ? আমার মনে চাইছিল তোমাদের জন্য এখন ‘বদদোয়া’ করি, যেন তোমাদের চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। এ কথা বলার সাথে সাথে সকলে নিজ নিজ শোক পোশাক খুলে ফেলে তাওবা করল। সুতরাং, শোক প্রকাশের উদ্দেশ্যে কোনো বিশেষ ধরণের পোশাক পরিধান করা, কোনো নির্দশন ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন